হামে আক্রান্ত সন্তানের জন্য প্রতিবন্ধী বাবার জীবনযুদ্ধ !


অনলাইন ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি , আপডেট করা হয়েছে : 22-05-2026

হামে আক্রান্ত সন্তানের জন্য প্রতিবন্ধী বাবার জীবনযুদ্ধ !

আসলাম দাড়িয়ার বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন এক নির্মম জ্বরের আঘাতে অবশ হয়ে গিয়েছিল তাঁর দুটি পা। সেই থেকে আজীবন হাত আর হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলাই তাঁর নিয়তি। কিন্তু নিয়তির সেই নিষ্ঠুরতাকে জয় করে অটোভ্যান চালিয়ে কোনো রকমে এতকাল সংসার টানছিলেন তিনি। এবার তাঁর পিতৃত্বের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক কঠিন ও অগ্নিপরীক্ষা। নিজের সাত মাস বয়সী শিশুপুত্র তাজিমকে বাঁচাতে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ৯ নম্বর বেডের সামনে এখন দিনরাত কাটছে এই প্রতিবন্ধী বাবার। হামের মারাত্মক জটিলতায় আক্রান্ত নিষ্পাপ সন্তানকে দেখতে আইসিইউর ঠাণ্ডা মেঝেতে হাত-পায়ে ভর দিয়ে যখন আসলাম এগিয়ে যান, তখন সেখানে উপস্থিত অন্য অভিভাবক ও চিকিৎসকদের চোখ ভিজে ওঠে। তবে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর চিকিৎসকদের মুখে আশার বাণী শুনে এই সংগ্রামী বাবার কণ্ঠে এখন কিছুটা স্বস্তির আভাস পাওয়া গেছে।

কোটালীপাড়া থেকে ঢাকা: এক নিঃসস্ব বাবার করুণ যাত্রা

আসলামের এই কষ্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে। চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার ছোট তাজিম জন্মের পর থেকেই নানাবিধ অসুখে ভুগছিল। সম্প্রতি প্রচণ্ড জ্বর, কাশি ও নিউমোনিয়ার সাথে শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিলে তাকে প্রথমে কোটালীপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসকেরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। গত শনিবার ঢাকার শিশু হাসপাতালে আনার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই চিকিৎসকেরা তাজিমের ফুসফুসের অবস্থা দেখে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করান। সেখানে চিকিৎসার জন্য একেকটি ১৫ হাজার টাকা মূল্যের তিনটি অতি জরুরি ইনজেকশনসহ আনুষঙ্গিক ওষুধ কিনতে গিয়ে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েন এই দরিদ্র বাবা। অটোভ্যান চালিয়ে যেখানে দৈনিক আয়ে সংসার চালানোই দায়, সেখানে ধারদেনা করে ইতিমধ্যেই প্রায় এক লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছেন আসলাম। হাসপাতালের এক মানবিক নারী চিকিৎসকের ব্যক্তিগত আর্থিক সহায়তায় একটি ইনজেকশন কেনা সম্ভব হলেও বাকি খরচ জোগাতে না পেরে একপর্যায়ে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার চরম ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছিলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পাশে দাঁড়াল জেলা প্রশাসন

এমন এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতে আসলামের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা khanm। টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হতে বসা এই অসহায় বাবার করুণ আকুতি ও জীবনযুদ্ধ দেখে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, অটোভ্যানচালক আসলামের এই সংকটে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে জেলা প্রশাসন শিশুটির চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে। জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম আসলামের হাতে নগদ ৫০ হাজার টাকা তুলে দেন এবং আশ্বস্ত করেন যে, চিকিৎসার জন্য পরবর্তীতে যেকোনো প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসন তা বহন করবে। এই রাষ্ট্রীয় সহায়তার পর আসলামের ভেতরের দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা মেঘ কিছুটা কেটেছে। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, "জেলা প্রশাসক ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে আমার হাতে টাকা দিয়া যাওয়ার পর চিন্তাটা একটু কমছে। ম্যাডাম বলছেন পরে কিছু লাগলে তাঁরে জানাইতে। এখন শুধু একটাই প্রার্থনা, ছেলেডারে যেন সুস্থ কইরা বাড়ি ফিরায়া নিয়া যাইতে পারি।"

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

আসলামের পুত্র তাজিম আইসিইউ থেকে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার পথে থাকলেও, দেশের সামগ্রিক হাম পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও মহামারী রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর জটিলতায় আরও ৭টি শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩ জন এবং হামের উপসর্গে ৪ জন মারা গেছে। গত বুধবার সকাল আটটা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ে এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো রেকর্ড করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই এক দিনেই সারা দেশে নতুন করে আরও ১ হাজার ৪২৩টি শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এবং ২০৮ জনের শরীরে ল্যাব টেস্টে নিশ্চিতভাবে এই রোগ শনাক্ত হয়েছে।

গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে দেশে এ পর্যন্ত মোট ৫৯ হাজার ২৭৯ জন শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা গেছে, যার মধ্যে ৮ হাজার ২৭৫ জনের শরীরে রোগটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৬ হাজার ৪০৭টি শিশু ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪২ হাজার ৩৩৬ জন। তবে দুর্ভাগ্যবশত, এই প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ৪৮৮টি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে নিশ্চিত হামে ৮৩ জন এবং হামের উপসর্গে ৪০৫ জন শিশু রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং শিশুদের জ্বর-কাশির সাথে শরীরে দানা দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।


অফিস: নিউ ইস্কাটন রোড, মগবাজার, ঢাকা-১০০০

ইমেইল : info@trendnewsbd.com