ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির ক্ষুব্ধ ও বেকার তরুণ সমাজের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ও অভিনব প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করার পর জেন-জি (প্রজন্ম জেন-জি) তরুণরা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছে অদ্ভুত এক হাস্যরসকে। তারা গড়ে তুলেছে সম্পূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক ও ডিজিটাল এক ‘রাজনৈতিক দল’, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভার্চুয়াল দলের উত্থান এতটাই উল্কাবেগে ঘটেছে যে, এটি এখন ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে এক বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই নজিরবিহীন অনলাইন আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি তীব্র অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য। সম্প্রতি এক মামলার শুনানিতে বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণ ও অ্যাক্টিভিস্টদের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, কিছু তরুণ আছে তেলাপোকার মতো, যারা কোনো চাকরি বা পেশায় জায়গা করতে না পেরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা জনস্বার্থমূলক প্রচারণায় জড়িয়ে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করে। তাঁর এই ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’র তুলনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ভারতের কোটি কোটি বেকার তরুণের আত্মসম্মানে আঘাত হানে। যদিও পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে তিনি কেবল ভুয়া ডিগ্রিধারীদের বুঝিয়েছেন, কিন্তু ততক্ষণে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।
প্রধান বিচারপতির এই উপহাসকে গায়ে মেখে না নিয়ে, বরং এটিকে প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বানিয়েছে তরুণরা। কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতার জন্য পরিচিত তেলাপোকাকে তারা নিজেদের ‘সারভাইভাল’ বা টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সিজেপির ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট চালু করা হয়। এরপরের গল্পটি কেবলই ইতিহাস। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে, গত বৃহস্পতিবারের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ (১৫ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে। অবিশ্বাস্য তথ্য হলো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অনুসারী যেখানে ৮৮ লাখ, সেখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছাড়াই এই ব্যঙ্গাত্মক দল মোদির দলকে বিশাল ব্যবধানে পেছনে ফেলে দিয়েছে।
ইউএস-এর বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে, যিনি এই উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি জানান যে এই তুমুল সাড়া সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। তাঁর মতে, ভারতীয় তরুণরা কর্মসংস্থানের অভাব ও দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব নিয়ে চরম হতাশ এবং সরকারের ওপর গভীরভাবে ক্ষুব্ধ। ক্ষোভ প্রকাশের কোনো গণতান্ত্রিক জায়গা না পেয়ে তারা এই মিম ও ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিয়েছে। সিজেপির সদস্য হওয়ার জন্য তারা মজার কিছু শর্তও জুড়ে দিয়েছে—যেমন প্রার্থীকে বেকার ও অলস হতে হবে এবং সারাক্ষণ অনলাইনে পেশাদারের মতো রাগ ঝাড়তে জানতে হবে। তাদের ইশতেহারেও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে ভারতের ভোট কারচুপি, করপোরেট গণমাধ্যমের চাটুকারিতা এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের সরকারি পদায়নের মতো স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে খোঁচা দেওয়া হয়েছে।
সমালোচক ও মোদি সমর্থকেরা এই আন্দোলনকে ‘বিরোধী দলের সস্তা অনলাইন চটক’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের আদলে ভারতের এই জেন-জি আন্দোলনও এখন আর কেবল ডিজিটালেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বেশি তরুণ, যারা তীব্র চাকরিসংকটে ভুগছেন, তাদের অনেকেই এখন তেলাপোকার কস্টিউম বা পোশাক পরে রাজপথের বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।
আন্দোলনের এই বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে ইতিমধ্যে সরকারের তরফ থেকে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। গতকাল কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই প্রায় দুই লাখ অনুসারী থাকা সিজেপির অফিশিয়াল ‘এক্স’ (টুইটার) অ্যাকাউন্টটি ভারতে ব্লক বা আটকে দেওয়া হয়েছে। তবে দমে যাওয়ার পাত্র নয় এই জেন-জি প্রজন্ম। অ্যাকাউন্ট বন্ধের কয়েক মিনিটের মধ্যেই নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে পোস্ট করেছেন—‘তেলাপোকা ফিরে এসেছে। ভেবেছেন আমাদের সরিয়ে দিতে পারবেন? হা হা।’ এই একটি পোস্টই প্রমাণ করে, আধুনিক যুগের তরুণদের প্রতিবাদের ভাষা ও দমিয়ে রাখার সমীকরণ কতটা বদলে গেছে।