বাংলাদেশের স্বপ্ন ও সক্ষমতার প্রতীক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আজ দৃশ্যমান বাস্তব। যদিও বর্তমান সময়ে এই প্রকল্পের কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, তবে ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে একটি অনস্বীকার্য সত্য বেরিয়ে আসে: রূপপুর প্রকল্পের প্রশাসনিক ভিত্তি স্থাপন, নীতিগত অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। আজকের সম্পাদকীয়তে আমরা রূপপুরের বিবর্তনে বিএনপির সেই বিস্মৃতপ্রায় ঐতিহাসিক ভূমিকাগুলো দালিলিক তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করব।
স্বাধীনতার পর নানা কারণে রূপপুর প্রকল্পটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। ১৯৭৭ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন।
নতুন সমীক্ষা: ১৯৭৭-৭৮ সালে তাঁর সরাসরি নির্দেশনায় প্রকল্পের উপযোগিতা যাচাইয়ে নতুন করে সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়।
বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ: তৎকালীন সময়ে দেশের রিজার্ভ সীমিত থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ করেন।
নীতিগত অনুমোদন: ১৯৮০ সালে তিনি রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত নীতিগত অনুমোদন দেন। যদিও ফ্রান্স ও সৌদি আরব থেকে অর্থায়নের চেষ্টা তৎকালীন ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে সফল হয়নি, কিন্তু তিনিই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রকল্পের জন্য "পলিটিক্যাল উইল" বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করেছিলেন।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর রূপপুর প্রকল্পকে ফাইলবন্দি দশা থেকে মুক্ত করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি: ১৯৮৭-৮৮ সালের ঝিমিয়ে পড়া কমিটিকে পুনর্গঠন করে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়।
ঐতিহাসিক সভা (১৯৯৫): ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সভায় রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত এবং আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
৬০০ মেগাওয়াটের রোডম্যাপ: এই সময়েই পরমাণু শক্তি কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পেশ করে, যেখানে ৬০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমান প্রকল্পের বিশালতার ভিত্তি ছিল মূলত সেই পরিকল্পনা।
বিএনপির পরবর্তী শাসনামলে (২০০১-২০০৬) রূপপুর প্রকল্পটি কেবল অভ্যন্তরীণ ফাইলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে যায়।
চীন-বাংলাদেশ চুক্তি: ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলেই চীনের সাথে 'পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার' শীর্ষক একটি ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিটিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পারমাণবিক সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তাকে আইনগত বৈধতা প্রদান করে।
একটি মেগা প্রকল্প রাতারাতি সম্পন্ন হয় না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্তমান অবকাঠামো এবং রাশিয়ার সাথে অর্থায়ন চুক্তিটি পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পাদিত হলেও, এর প্রশাসনিক কাঠামো, নীতিগত শক্ত ভিত্তি এবং প্রাক-প্রস্তুতির সিংহভাগই সম্পন্ন হয়েছিল বিএনপি সরকারের আমলে।
প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, রূপপুর প্রকল্প কোনো একক দলের নয়, বরং এটি একটি জাতীয় স্বপ্ন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ বিচারে এটি স্বীকার করতেই হবে যে, ১৯৭৭ সালে শহীদ জিয়ার উদ্যোগ থেকে শুরু করে ১৯৯৫ ও ২০০৫ সালে বেগম জিয়ার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো ছাড়া আজকের রূপপুর বাস্তবায়ন অসম্ভব ছিল।
উপসংহার: রাজনীতির ময়দানে কৃতিত্বের ভাগাভাগি চলতে পারে, কিন্তু দালিলিক ইতিহাস বদলানো যায় না। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় যে, রূপপুর প্রকল্পের আধুনিক যাত্রার প্রতিটি মোড়ে বিএনপির সাহসী ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো বিদ্যমান ছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যটি স্বীকার করে নেওয়া কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচারই নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করা।