পবিত্র মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে যিনি গত ১৯ বছর ধরে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আসছেন, সেই ইমামই আজ নিজ কর্মস্থলে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। জামালপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত নতুন হাইস্কুল জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আলাউদ্দিনের কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং তা না পেয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলার চেষ্টার এক ন্যাক্কারজনক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় যুবদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে।
এই ঘটনা কেবল একটি চাঁদাবাজির চেষ্টা নয়, বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা এবং একজন আলেমের সম্মানের ওপর চরম আঘাত হিসেবে দেখছেন সাধারণ মুসল্লিরা।
ঘটনার গভীরে গিয়ে জানা যায়, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো এই মসজিদ পরিচালনা কমিটিও পুনর্গঠন করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, নতুন এই কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অন্তর্ভুক্ত হন জেলা যুবদলের সদস্য ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ কালু এবং একই ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল রানা।
কমিটিতে আসার পর থেকেই এই দুই নেতার বিরুদ্ধে মসজিদের সম্পদ ও আয়ের ওপর নজর দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মসজিদের একটি দোকান তারা জোরপূর্বক দখল করে দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। এমনকি মসজিদের মাসিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ তারা নিজেদের পকেটে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন।
ইমাম মাওলানা আলাউদ্দিনের অভিযোগ, এই দুই নেতা তাঁর কাছে সরাসরি এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। ১৯ বছর ধরে নিঃস্বার্থ সেবা দিয়ে আসা এই ইমাম সেই অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করলে শুরু হয় অকথ্য গালিগালাজ।
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তারেক চৌধুরী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন:
"তারা বাঁশ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ইমাম সাহেবের ওপর চড়াও হতে আসে। আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। একজন আলেমের সাথে এমন আচরণ কল্পনা করা যায় না! সাধারণ মুসল্লিরা রুখে না দাঁড়ালে আজ বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেত।"
ঘটনার পর জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতা মসজিদে গিয়ে ইমামকে চাপ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
ইমাম নিজে অভিযোগ করেছেন যে, তাঁর মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেওয়া হয় এবং তাঁর ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে একটি পোস্ট দেওয়া হয়, যেখানে দাবি করা হয় বিষয়টি কেবল একটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল প্রতিবাদের কণ্ঠ রোধ করার একটি কৌশল।
অভিযুক্ত জুয়েল রানা দাবি করেছেন, তারা কেবল ইমামের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলেন এবং কোনো চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটেনি। তবে অপর অভিযুক্ত হারুনুর রশিদ কালুকে এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে না এবং তাঁর ফোনটিও বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হয় কি না, নাকি ‘ভুল বোঝাবুঝির’ তকমা দিয়ে পার পেয়ে যাবেন অভিযুক্তরা।