জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল শারীরিক অস্বস্তির কারণ নয়; এটি বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ও নিরাপত্তার জন্য এক অস্তিত্ব সংকটে পরিণত হয়েছে। মাঠের ফসল থেকে শুরু করে সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ—সবই এখন ধ্বংসের মুখে। জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিশ্বের অন্তত ১০০ কোটির বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকা চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) তাদের সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া (বিশেষ করে ভারত), সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষকদের জন্য বাইরে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
অনিরাপদ কর্মঘণ্টা: বছরের প্রায় ২৫০ দিন বা দুই-তৃতীয়াংশ সময় কৃষকদের জন্য খোলা মাঠে কাজ করা জীবনঘাতী হয়ে পড়বে।
উৎপাদন বিপর্যয়: তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলেই অধিকাংশ প্রধান ফসলের উৎপাদন কমতে শুরু করে। ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং গমের ফলনেও একই নেতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তাপপ্রবাহ কেবল উদ্ভিদ নয়, প্রাণিকুলের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
পশুপালন: গবাদিপশু মাত্র ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থেকেই ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত চাপে পড়ে। এতে দুধের পরিমাণ কমার পাশাপাশি দুধে চর্বি ও প্রোটিন কমে যায়। বিশেষ করে শূকর ও মুরগির মতো প্রাণী, যারা ঘামতে পারে না, তাদের হজমতন্ত্র ও হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে মৃত্যুর হার বাড়ছে।
সমুদ্রের উত্তাপ: স্থলভাগের মতো সমুদ্রেও তাপপ্রবাহ বাড়ছে। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় মৎস্যসম্পদ উজাড় হচ্ছে, যা সামুদ্রিক খাদ্যচক্রকে বিপর্যস্ত করছে।
বিশ্ব সম্পদ ইনস্টিটিউটের কৃষি পরিচালক রিচার্ড ওয়েট একটি ভয়াবহ ‘দুষ্টচক্রের’ কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান “যদি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে কৃষকদের সঠিক সরঞ্জাম ও জ্ঞান না দেওয়া হয়, তবে উৎপাদন কমে যাবে। সেই ঘাটতি মেটাতে আরও বেশি জমি চাষের আওতায় আনতে হবে, যা বন উজাড় করবে এবং কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করবে।”
অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞ মলি অ্যান্ডারসন মনে করেন, বর্তমান শিল্পভিত্তিক খাদ্যব্যবস্থা মাত্র কয়েকটি বিশেষ ফসলের ওপর অতি-নির্ভরশীল হওয়ায় এটি বড় কোনো ধাক্কা সামলাতে সক্ষম নয়। তিনি খামারে বৈচিত্র্য আনা এবং ছায়া ও গাছপালার উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
ক্ষুদ্র কৃষকদের সংগঠন ‘লা ভিয়া ক্যাম্পেসিনা’-র সমন্বয়ক মরগান ওডি শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষা দাবি করেছেন:
কাজের সময় নির্ধারণ: মাঠে বা নৌকায় কতক্ষণ কাজ করা যাবে তার নির্দিষ্ট নিয়ম।
সুযোগ-সুবিধা: নিয়োগদাতাদের পক্ষ থেকে বিশুদ্ধ পানি, বিশ্রাম ও ছায়ার ব্যবস্থা।
ক্ষতিপূরণ: প্রান্তিক কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য ঋণ মওকুফ ও সরকারি বিনিয়োগ।
এত নেতিবাচক খবরের মাঝেও জাতিসংঘ একটি সম্ভাবনার কথা বলেছে। বর্তমান প্রযুক্তির কল্যাণে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস আগেভাগেই দেওয়া সম্ভব। মুঠোফোনের মাধ্যমে এই আগাম বার্তা কৃষকদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা একমত যে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে এবং অভিযোজন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে।