সম্প্রতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ির সুবিধা দাবি করেছেন এনসিপি নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। এই দাবি নিয়ে দেশজুড়ে যখন তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তখন বিষয়টি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবেক এনসিপি নেত্রী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনিম জারা।
ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এমপিদের কাজ জনগণের সেবক হিসেবে তাঁদের সমস্যা দূর করা, নিজেদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার ফর্দ লম্বা করা নয়।
তাসনিম জারা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে সংসদ সদস্যদের দাবির তুলনা করে লিখেন:
বঞ্চিত শিক্ষক ও কর্মচারী: শিক্ষকরা ন্যায্য বেতনের দাবিতে রাস্তায় দিন কাটাচ্ছেন, সরকারি কর্মচারীরা বছরের পর বছর পে-স্কেল সংশোধনের অপেক্ষায় আছেন।
পেশাজীবীদের আন্দোলন: ডাক্তার ও নার্সরা নিজেদের অধিকার আদায়ে কর্মবিরতি ও আন্দোলন করছেন।
কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর হাহাকার: সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা যখন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন সংসদে এমপিদের ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়ে আলোচনা করাটা অনভিপ্রেত।
জারা প্রশ্ন তুলে বলেন, "জনগণের সমস্যায় যে দ্রুততা আর ঐক্য দেখা যায় না, এমপিদের সুযোগ-সুবিধার দাবিতে কেন তা তৎক্ষণাৎ হাজির হয়?"
এমপিরা নিজেরাই নিজেদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করবেন—এই প্রথাকে নীতিগতভাবে ভুল আখ্যা দিয়ে জারা বলেন:
স্বার্থের সরাসরি সংঘাত: পৃথিবীর কোনো পেশায় মানুষ নিজের বেতন নিজে ঠিক করে না। ডাক্তার, শিক্ষক বা সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন নির্ধারিত হয় নিরপেক্ষ কাঠামো বা বোর্ডের মাধ্যমে।
জনগণের করের টাকা: এমপিদের সকল সুবিধা আসে সাধারণ মানুষের কর থেকে। তাই সেই টাকার পরিমাণ তাঁরা নিজেরাই ঠিক করবেন, এটি নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
এমপিদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে একটি স্বাধীন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তাসনিম জারা। তাঁর মতে এই কমিটির দায়িত্ব হবে:
তুলনামূলক বিচার: একজন জেলা জজ, সচিব বা অধ্যাপকের সাথে তুলনা করে একজন এমপির দায়িত্ব ও ঝুঁকি বিবেচনা করে একটি যৌক্তিক বেতন কাঠামো বের করা।
প্রাসঙ্গিকতা যাচাই: বর্তমান যুগে শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ির মতো সুবিধাগুলোর যৌক্তিকতা আছে কিনা তা পর্যালোচনা করা।
প্রয়োজনীয় বরাদ্দ বৃদ্ধি: যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলের এমপিদের অফিস বা যাতায়াত খরচ বাড়ানো প্রয়োজন হয়, তবে সেটিও নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা।
জারা প্রস্তাব করেন যে, এই কমিটিতে কেবল অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞ নয়, বরং সমাজের সাধারণ স্তরের প্রতিনিধিদেরও রাখতে হবে। একজন স্কুলশিক্ষক, একজন নার্স বা একজন ছোট ব্যবসায়ীকে রাখার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হবে যে সাধারণ মানুষের জীবনমানের সাথে এমপিদের প্রাপ্তির অনুপাত কতটুকু হওয়া উচিত।