ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এবারের ভর্তি পরীক্ষার এই ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গভীর এবং উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। জিপিএ-৫ পাওয়া ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থীর এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং প্রকৃত মেধার মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনের মূল কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন বা গাইড বই মুখস্থ করে ভালো জিপিএ অর্জন করতে পারে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা মূলত অ্যানালিটিক্যাল বা বিশ্লেষণধর্মী। সেখানে মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে মৌলিক ধারণা বা 'বেসিক' বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যারা কেবল জিপিএ অর্জনের নেশায় পড়াশোনা করেছে, তারা এই কঠিন প্রতিযোগিতায় খেই হারিয়ে ফেলছে।
বিগত কয়েক বছরে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এই উচ্চ গ্রেড অনেক সময় শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞানকে প্রতিফলিত করে না। যখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সহজ হয় বা উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিথিলতা দেখানো হয়, তখন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ গ্রেড পেয়ে যায়। একে বলা হয় গ্রেড ইনফ্লেশন (Grade Inflation), যা ভর্তি পরীক্ষার মতো প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে বড় ধাক্কা দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এখন বহুনির্বাচনী (MCQ) এবং লিখিত—উভয় পদ্ধতিই বিদ্যমান। এইচএসসি পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নে যেভাবে উত্তর লিখতে হয়, ভর্তি পরীক্ষার সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়ার কৌশল তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এছাড়া নেতিবাচক মার্কিং (Negative Marking) থাকার কারণে অনেক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ভুল উত্তর দিয়ে স্কোর হারিয়ে ফেলে।
মূল পাঠ্যবই (Textbook) পড়ার চেয়ে অনেক শিক্ষার্থী কোচিং সেন্টারের শিট বা শর্টকাট টেকনিকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে করে কোনো বিষয়ের গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয় না। ফলে যখনই প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, তারা আর উত্তর করতে পারে না।
এই সংকট উত্তরণে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:
মূল্যায়ন পদ্ধতি সংস্কার: বোর্ড পরীক্ষাগুলোতে কেবল তথ্যের চেয়ে প্রয়োগমূলক জ্ঞানের ওপর জোর দেওয়া।
ভর্তি পরীক্ষার সাথে সমন্বয়: উচ্চমাধ্যমিকের পাঠদান পদ্ধতিকে এমনভাবে সাজানো যাতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকে।
শিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধি: শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার অভ্যাস তৈরি করা।
আপনার মতে, জিপিএ-৫ পাওয়ার এই হার কমিয়ে যদি মূল্যায়নের মান আরও কঠোর করা হতো, তবে কি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য তৈরি হওয়া সহজ হতো?