আলী খামেনির জন্ম হয়েছিল এক চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। মাশহাদের একটি সরু গলিতে এক কামরার ঘরে বড় হওয়া খামেনি শৈশবে অনেক রাত কাটিয়েছেন অনাহারে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্বল্পভাষী আলেম। খামেনি নিজেই একবার বলেছিলেন, "মাঝে মাঝে আমাদের ঘরে রাতের খাবার থাকত না, মা কোনোমতে কিশমিশ আর রুটি দিয়ে আমাদের ভুলিয়ে রাখতেন।" এই অভাবের সংসার থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অনুরাগী হন, যা তাঁকে পরবর্তীতে ইরাকের নাজাফ এবং ইরানের কোম শহরে নিয়ে যায়।
১৯৬০-এর দশকে আয়াতুল্লাহ খোমেনির সান্নিধ্যে এসে খামেনির রাজনৈতিক জীবন মোড় নেয়। শাহ সরকারের শাসনকালে তিনি বারবার কারাবরণ করেন। সাভাকের (তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা) অমানবিক নির্যাতনও তাঁর আদর্শকে টলাতে পারেনি। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি যখন ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন, ঠিক তখনই ১৯৮১ সালে এক ভয়াবহ বোমা হামলায় তাঁর ডান হাত চিরতরে অবশ হয়ে যায়। সেই থেকে পঙ্গু হাতটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক।
১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর অনেকেই ভেবেছিলেন ইরান ভেঙে পড়বে। কিন্তু খামেনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। প্রেসিডেন্ট থেকে হয়ে ওঠেন 'সুপ্রিম লিডার' বা সর্বোচ্চ নেতা। তাঁর শাসনামলে ইরান একদিকে যেমন পারমাণবিক শক্তিতে বলীয়ান হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে তৈরি হয়েছে চরম বৈরিতা। হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল এক সশস্ত্র নেটওয়ার্কের মূল কারিগর ছিলেন তিনি। নিজের দেশে বিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে 'প্রতিরোধের অক্ষ' গড়ে তোলার কারণে তিনি বন্ধু ও শত্রু—উভয় পক্ষের কাছেই এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
২০২৬ সালের সেই শেষ প্রহর পর্যন্ত তিনি ছিলেন অদম্য। ২৮ ফেব্রুয়ারি এক বিমান হামলায় তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে থমকে গেছে পুরো ইরান। তেহরানের রাজপথে আজ একদিকে যেমন শোকের ছায়া, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধছে গভীর উদ্বেগ—'এরপর কী?'
খামেনির মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং একটি আদর্শিক যুগের সমাপ্তি। তাঁর অবর্তমানে ইরান কি কঠোর পন্থায় অটল থাকবে, নাকি সংস্কারের নতুন কোনো পথে হাঁটবে—সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে। আপাতত ৪০ দিনের জাতীয় শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছে পারস্যের এই ভূমি।