সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে ২১ নভেম্বর ২০২৫, সকাল ১০:৩৮ মিনিটে। এই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পটি দেশের কেন্দ্রীয় অংশ — ঢাকা ও নরসিংদী সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় কম্পন সৃষ্টি করে। ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ সংস্থাগুলোর (USGS ও GFZ) তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ম্যাগনিচিউড ৫.৫–৫.৭, এবং এর গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার — যা তুলনামূলকভাবে কম, ফলে ভূ-পৃষ্ঠে কম্পন বেশি অনুভূত হয়।
এই ভূমিকম্পে মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সরকারি সূত্রে সংখ্যা ভিন্ন হওয়ায় সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনো একীভূত নয়।
AP নিউজ জানিয়েছে, অন্তত ১০ জন নিহত এবং ৪৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
People Magazine একই ধরনের সংখ্যা নিশ্চিত করেছে — ৮ জনের মৃত্যু ও ৪০০–৪৫০ জন আহত।
অন্যদিকে, Reuters কিছু সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে বলেছে, ৩ জন নিহত হয়েছেন এবং আহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
কম্পনের সময় আতংকে মানুষ ভবন থেকে বের হতে গিয়ে, পুরোনো বা দুর্বল স্থাপনা ধসে পড়ায় এবং কিছু জায়গায় রেইলিং ভেঙে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঢাকার বিভিন্ন অংশ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকায় এই কম্পন তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পটি ছিল শ্যালো বা অগভীর কম্পন, যা বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
দেশের ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে —
বাংলাদেশের নিচ দিয়ে থাকা ফল্ট লাইনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চাপ জমতে পারে,
মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো কখনো কখনো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস — যদিও নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না,
দেশের বহু ভবন এখনো ভূমিকম্প-সহনশীল নকশায় নির্মিত নয়, যা বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
নভেম্বর মাসে রাজধানীসহ কয়েকটি এলাকায় ছোটমাপের আফটারশক বা নিম্নমাত্রার কম্পনও অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় কম্পনের পরে কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত এ ধরনের অনুগমন কম্পন হওয়া স্বাভাবিক।
২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পের ঘটনাটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে বাংলাদেশ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চলে অবস্থিত। হতাহতের সংখ্যা উৎসভেদে ভিন্ন হলেও এটি স্পষ্ট — মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও দেশের দুর্বল অবকাঠামো, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং প্রস্তুতির ঘাটতি বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে।
এখনই সময় — সরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ জনগণকে একসাথে প্রস্তুতি জোরদার করার।
“ড্রপ, কভার, হোল্ড” — মাটিতে বসুন, মাথা ঢাকুন এবং মজবুত কিছু ধরে থাকুন।
জানালা, কাচ, ভারী শেলফ বা ঝুলন্ত বস্তু থেকে দূরে থাকুন।
লিফট ব্যবহার করবেন না।
বাড়িতে একটি ইমার্জেন্সি কিট রাখুন — পানি, শুকনো খাবার, ফার্স্ট-এড, পাওয়ার ব্যাংক, টর্চ, ব্যাটারি, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।
পরিবারের সবার জন্য জরুরি মিলনস্থল নির্ধারণ করুন।
স্কুল, অফিস ও ভবনে নিয়মিত মহড়া চালু করতে হবে।
নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা নিশ্চিত করতে হবে।
পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর স্ট্রাকচারাল অডিট করাতে হবে।
ঢিলেঢালা নির্মাণ, চোরাই সামগ্রী বা নিম্নমানের কনস্ট্রাকশনের উপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা আপডেট করা
উদ্ধার ও ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানো
জনগণের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা
ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু প্রস্তুতি ও সচেতনতা আমাদের উপর আসবে প্রভাব অনেকাংশে কমাতে পারে। দায়িত্ব আছে সরকারের, বিজ্ঞানীদের এবং প্রতিটি নাগরিকের — সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে বড় দুর্যোগ এলে ক্ষয়ক্ষতি কম হয় এবং জীবন রক্ষা করা যায়।